দুঃখের কথা কাকে বলা উচিত

আমরা প্রায়ই মনে করি, আমাদের দুঃখ-কষ্টগুলো অন্যের কাছে শেয়ার করলে অন্তর কিছুটা হালকা হবে। কেউ হয়তো সমাধান দেবে অথবা সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা অধিকাংশ সময় ভিন্ন হয়।

সব মানুষ আমাদের অনুভূতি বোঝার বা সত্যিকারের সহানুভূতি দেখানোর ক্ষমতা রাখে না। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ অন্যের দুর্বলতা বা দুঃখের সুযোগ নেয়। কখনো অন্যের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উপহাস করে, তাচ্ছিল্য করে।

এতে কষ্টে থাকা মানুষের যাতনা যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। নিজেকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত মনে হয়। তখন বারবার মনে হয়—মনের অতলে কষ্টগুলো পাথরচাপাই তো ভালো ছিল, কেন বলতে গেলাম?

আসলে, যদি একজন ভেঙে পড়া মানুষ সঠিক সমব্যথী না পান, তবে দয়াহীন মানুষ তার উপকারের বদলে উল্টো ক্ষতিই করে ফেলে।
আলী (রা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তি
এ কারণেই আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর একটি মূল্যবান উক্তি আমাদের মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে কষ্টের অভিযোগ করা অপমান।’ (নাহজুল বালাগা, হিকমাহ: ৩৩০; সংকলক: শরিফ রাজি)

এই উক্তিটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে মানুষের কাছে নিজের দুঃখ বলে বেড়ানোর অভ্যাস নিজেকে স্বেচ্ছায় লাঞ্ছিত করারই নামান্তর। কারণ, সত্যিকারের সমমর্মী মানুষ এ পৃথিবীতে বড়ই দুর্লভ।

বর্তমান সময়ের রূঢ় বাস্তবতা
যাকে আপনি নিজের কষ্টের কথা বলবেন, সে হয়তো ইতোমধ্যেই আপনাকে কষ্ট দিয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে দিতে পারে। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবন এবং অনলাইনের রঙিন–দুনিয়ায় এতটাই ব্যস্ত যে অন্যের গভীরে যাওয়ার সময় তাদের নেই।

একটি মর্মান্তিক খবর পড়ে মুহূর্তের জন্য মন ভারী হলেও, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আরেকটি ‘স্ক্রল’ সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।

মানুষের কষ্ট শোনার ধৈর্য কমে গেছে, অনুভবের গভীরতাও হারিয়ে গেছে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় নিজের কষ্ট অন্যের কাছে তুলে ধরার চেয়ে মহান রবের কাছে বলাই অধিক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ।
প্রকৃত আশ্রয় যেখানে
মহান আল্লাহ কখনোই উদাসীন হন না, তিনি বান্দার আর্তনাদ ভুলে যান না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘…যখন তুমি কোনো কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২,৫১৬)

আমাদের দুঃখ, বেদনা ও কষ্টের অনুভূতিগুলো সেই মহান রবের কাছেই প্রকাশ করা উচিত, যিনি আমাদের অন্তরের প্রতিটি স্পন্দন নিখুঁতভাবে জানেন। মানুষের কাছে আমাদের চোখের জল কিংবা দীর্ঘশ্বাসের মূল্য না থাকলেও, তিনি বান্দার প্রতিটি অশ্রুকণা এবং হৃদয়ের গভীর ব্যথা অনুভব করেন এবং তার উত্তম প্রতিদান দেন।
আমাদের করণীয়
ছোট্ট শিশুটি যেমন মায়ের আঁচল ধরে কোনো কিছু না পাওয়া পর্যন্ত কান্না থামায় না, ঠিক সেভাবেই আল্লাহর দুয়ারে কড়া নেড়ে যান। বারবার তাঁর দরবারে যান। তিনি আপনাকে দেবেন, যা আপনার জন্য কল্যাণকর।

তিনি তো বান্দার জন্য এমন এক আশ্রয়দাতা, যাঁর কাছে শতবার কাঁদলেও তিনি বিরক্ত হন না। বরং তিনি তো সেই রব, যিনি না চাইলে অসন্তুষ্ট হন।

তিনি দুর্বল বান্দার জন্য শক্তি সঞ্চয়কারী, হৃদয়ের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া পরম দয়ালু প্রতিপালক। তাই আপনার যা কিছু অনুযোগ, যা কিছু ব্যথা—সব সঁপে দিন তাঁর কাছে। শান্তি আসবেই, ইনশা আল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *