কাজা রোজা আদায়ে কত দিন দেরি করা যাবে
শরয়ি কোনো ওজরের কারণে—যেমন অসুস্থতা, সফর, ঋতুস্রাব কিংবা গর্ভকালীন ও দুগ্ধদানকালীন সমস্যার কারণে রমজানে রোজা ভাঙার অনুমতি থাকলেও পরে তা কাজা করা বাধ্যতামূলক।
অনেক সময় দেখা যায়, অজ্ঞতা, অলসতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে অনেকে সময়মতো এই কাজা আদায় করতে পারেন না। এমনকি এক রমজানের কাজা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রমজান চলে আসে।
বিলম্বের কারণ ও দায়বদ্ধতা
রমজানের রোজা কাজা করার ক্ষেত্রে বিলম্ব সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে।
প্রথমত, কোনো সঙ্গত কারণে বিলম্ব হওয়া। যেমন—কেউ অসুস্থ ছিলেন এবং সেই অসুস্থতা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এক্ষেত্রে ব্যক্তি গুনাহগার হবেন না। তাঁকে কেবল সুস্থ হওয়ার পর সমপরিমাণ রোজা কাজা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিনা কারণে বা অলসতাবশত বিলম্ব করা। যিনি সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অবহেলা করে কাজা রোজাগুলো পরবর্তী রমজান পর্যন্ত পিছিয়ে দেন, তিনি শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহগার বা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।
কারণ ফরজ ইবাদত বিনা ওজরে বিলম্ব করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। তবে গুনাহগার হলেও তাঁর ওপর ওই রোজাগুলোর কাজা রাখা একইভাবে ফরজ হিসেবে বহাল থাকে।
পরবর্তী রমজান আসার পর করণীয়
যদি এক রমজানের কাজা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রমজান চলে আসে, তবে বিধান কী হবে? এ বিষয়ে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে দুটি প্রধান অভিমত পাওয়া যায়:
১. হানাফি মত: ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর অনুসারীদের মতে, বিলম্বের কারণ যা-ই হোক না কেন, কেবল কাজা আদায় করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত কোনো কাফফারা বা জরিমানা (ফিদইয়া) দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, “যে অসুস্থ থাকে কিংবা সফরে থাকে, সে অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূরণ করে নেবে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
এখানে আল্লাহ কেবল অন্য দিনে রোজা রাখার কথা বলেছেন, এর সঙ্গে কোনো অর্থদণ্ড বা খাবারের কথা উল্লেখ করেননি।
২. তিন ইমামের মত: ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদের (রহ.) এই তিন ইমামের মতে, যদি কেউ বিনা ওজরে কাজা আদায়ে বিলম্ব করে পরবর্তী রমজানে পৌঁছে যায়, তবে তাঁকে কাজা আদায়ের পাশাপাশি প্রতিটি রোজার বদলে একজন মিসকিনকে খাবার (ফিদইয়া) দিতে হবে।
তাঁরা সাহাবি আবু হোরাইরা (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কিছু বর্ণনাকে এর স্বপক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন।
শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.) মনে করেন, কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশের বাইরে সাহাবিদের ব্যক্তিগত মতের ভিত্তিতে আর্থিক দণ্ড বাধ্যতামূলক করা কঠিন। তাই সতর্কতামূলকভাবে কেউ যদি ফিদইয়া দেন তবে তা উত্তম, কিন্তু কেবল কাজা আদায় করলেই দায়ভার পূরণ হবে। (আশ-শারহুল মুমতি আলা জাদিল মুস্তাকনি, ৬/৪৪৫, দার ইবনুল জাওজি)
দীর্ঘস্থায়ী অক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা
যাঁরা বার্ধক্য বা এমন কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত যার নিরাময় হওয়ার আশা কম (যেমন—দুর্বলতা বা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা), তাঁদের ক্ষেত্রে রোজার কাজা রাখা জরুরি নয়। এমন ব্যক্তি প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন অভাবীকে দুই বেলা তৃপ্তিভরে খাওয়াবেন।
অনেক সময় দেখা যায়, নারী গৃহস্থালির কঠোর পরিশ্রম বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে রোজা রাখতে পারেন না। এমন ক্ষেত্রে শরিয়তের পরামর্শ হলো—রাতে রোজার নিয়ত করা।
দিনের বেলা কাজ করতে গিয়ে যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে রোজা রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, তবেই কেবল রোজা ভাঙা যাবে এবং পরে তা কাজা করতে হবে।
তবে যদি শারীরিক সক্ষমতা একেবারেই না থাকে, তবে তাঁরাও ফিদিয়া বা খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে দায়মুক্ত হতে পারেন।
শেষ কথা
ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, কাজা রোজা আদায়ে বিলম্বের ক্ষেত্রে যদি ওজর থাকে, তবে আলেমদের ঐক্যমত্য অনুযায়ী কেবল কাজাই যথেষ্ট। আর ওজর না থাকলে জমহুর বা অধিকাংশ আলেমের মতে ফিদইয়া দেওয়া মুস্তাহাব বা উত্তম। (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৬/৩৬৬, দারুল ফিকর, বৈরুত)
আল্লাহর সহজতা পছন্দ করেন এবং বান্দার জন্য যা সাধ্যের অতীত তা চাপিয়ে দেন না। তাই অসুস্থ বা দুর্বলদের জন্য ইসলামি বিধান অত্যন্ত নমনীয়। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/৪৯৭, দারু তৈয়্যিবাহ, ১৯৯৯)

Leave a Reply