মহানবীর সাহসিকতা থেকে শিক্ষা

ভয় ও বিপদের মুহূর্তে মানুষের আসল চরিত্র ফুটে ওঠে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, চরম সংকটে অনেক শক্তিশালী ব্যক্তিও খেই হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চরম বিপদেও তাঁর সাহসিকতা, ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তা ছিল অতুলনীয়।

তাঁর এই বীরত্ব কেবল বাহুবল ছিল না; বরং তা ছিল মহান আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ইনসাফ কায়েমের দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ।

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বীরত্বগাথা থেকে কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো:
হিজরতের রাতের নির্ভীকতা
মক্কার কাফেররা যখন রাসুল (সা.)-কে হত্যার জন্য তাঁর ঘর ঘেরাও করেছিল, তখন তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের সারির মাঝখান দিয়ে সুরা ইয়াসিনের আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে যান।

শত্রুরা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও আল্লাহ তাদের চোখে পর্দা ফেলে দিয়েছিলেন। নিজের জীবনের চরম ঝুঁকিতেও তাঁর এই অবিচল থাকা কেবল একজন নবী এবং অকুতোভয় নেতার পক্ষেই সম্ভব।

রণক্ষেত্রের অগ্রসেনানী
আল্লাহর রাসুল (সা.) কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না, বরং যুদ্ধের ময়দানে তিনি থাকতেন সবচেয়ে সামনের সারিতে।

হজরত আলীর সাক্ষ্য: বীর সেনানী হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘বদর যুদ্ধের তীব্রতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাত, তখন আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পেছনে আশ্রয় নিতাম। তিনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী এবং শত্রুর সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থানে থাকতেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬৫৪)

হুনাইনের যুদ্ধ: যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন মুসলিম বাহিনী কিছুটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল, তখন রাসুল (সা.) একাকী তাঁর সওয়ারি নিয়ে শত্রুর দিকে অগ্রসর হন এবং উচ্চকণ্ঠে নিজের পরিচয় দিয়ে সাহাবিদের মনোবল চাঙা করেন।
সাহসিকতার মূল উদ্দেশ্য
রাসুল (সা.)-এর সাহসিকতা নিজের বীরত্ব প্রমাণের জন্য ছিল না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা এবং জালিমদের হাত থেকে মজলুমদের রক্ষা করা।

তিনি আকাঙ্ক্ষা করতেন যেন আল্লাহর পথে শহীদ হন, আবার জীবিত হন এবং পুনরায় শহীদ হন। এটি শাহাদাতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং সাহসিকতারই প্রমাণ।
ইসলামে জিহাদ বা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া, যাতে তারা কোনো স্বৈরশাসকের দাস না হয়ে কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করতে পারে।

প্রজ্ঞা ও কৌশলগত বীরত্ব
রাসুল (সা.)-এর সাহসিকতা মানেই হঠকারিতা ছিল না, বরং তা ছিল যুক্তি ও কৌশলনির্ভর।

তায়েফ দুর্গ অবরোধের সময় যখন তিনি দেখলেন যে দীর্ঘ মেয়াদে অবরোধ চালালে মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক ক্ষতি হতে পারে এবং মদিনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, তখন তিনি সাহসিকতার সঙ্গে অবরোধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

একে আজকের যুগের পরিভাষায় ‘সোয়াট অ্যানালাইসিস’ বা লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিশ্লেষণ বলা যেতে পারে। সঠিক সময়ে পিছু হঠার সিদ্ধান্ত নেওয়াও একধরনের বড় সাহসিকতা।
বীরত্বের সঙ্গে দয়া ও ক্ষমার সমন্বয়
সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েও ক্ষমা করার নামই প্রকৃত বীরত্ব। মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসুল (সা.) নিজ হাতে কখনো কোনো নারী বা সেবককে আঘাত করেননি। তিনি ব্যক্তিগত কোনো কারণে কারও ওপর প্রতিশোধ নেননি। কেবল আল্লাহর আইন লঙ্ঘিত হলেই তিনি হকের পক্ষে কঠোর হতেন।

তবে ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) আল্লাহর পথ ব্যতিরেকে কখনো কাউকে প্রহার করেননি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,৭৭৬)

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাহসিকতা ছিল ইমান, নীতি এবং নৈতিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে বীরত্ব কেবল পেশিশক্তিতে নয়, বরং সত্যের ওপর অটল থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতায় নিহিত।

আজ মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর এই চারিত্রিক দৃঢ়তা এক চরম অনুপ্রেরণার উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *