ঘুমকেও কীভাবে ইবাদতে রূপান্তর করবেন

পবিত্র কোরআনের সর্বাধিক পঠিত সুরা হলো সুরা ফাতিহা। এর আয়াতগুলো আমাদের ঠোঁটের আগায় মুখস্থ থাকে, কিন্তু আমরা কি সত্যিই এই শব্দগুলোর গভীরতা অনুভব করি?

বিশেষ করে পঞ্চম আয়াতের সেই অংশটি, “আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই। (সুরা ফাতিহা, আয়াত: ৫)

সুরা ফাতিহার এই আয়াত ইবাদতের এক অনন্য দর্শন ব্যাখ্যা করে। ইবাদত মানে কেবল জায়নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; বরং সঠিক নিয়ত আর অন্তরের উপস্থিতির মাধ্যমে একজন মুমিন তার জীবনের অতি সাধারণ কাজগুলোকেও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম বা ইবাদতে রূপান্তর করতে পারেন।

ইবাদতের মূল নির্যাস কী
সৃষ্টিকর্তার যথাযথ ইবাদত করার জন্য প্রথমে ‘ইবাদত’ শব্দের প্রকৃত অর্থ বোঝা প্রয়োজন। ইবাদত মানে হলো আল্লাহর দাসত্ব বা তাঁর গোলামি করা। আমরা যখন বলি ‘ইয়্যাকা নাবুদু’ (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি), তখন আমরা স্বীকার করি যে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্পন্দন কেবল তাঁরই জন্য।

ইবাদতের মূলত তিনটি স্তর রয়েছে যা আমাদের আমলের গুণগত মান নির্ধারণ করে:

১. ভীতি: আল্লাহর শাস্তির ভয়ে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

২. আশা: তাঁর রহমত ও জান্নাত পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রাখা।

৩. ভালোবাসা: স্রষ্টার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তাঁর নির্দেশ পালন করা।

ইবাদতের পূর্ণতা আসে তখন, যখন এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটে। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাকো ভয়ে ও আশায়।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৬)

সাধারণ কাজ কীভাবে পুণ্যময় হয়
আপনি কি জানেন, আপনি যখন ঘুমান, বাজার করেন কিংবা ঘরের সাধারণ কাজ করেন, তখনও আপনার আমলনামায় পুণ্য লেখা হতে পারে? একে বলা হয় ‘আদত’ বা অভ্যাসকে ইবাদতে রূপান্তর করা। এর মূল চাবিকাঠি হলো আপনার ‘নিয়ত’ বা উদ্দেশ্য।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

ঘুম যখন ইবাদত: আপনি যদি এই নিয়তে রাতে ঘুমান যে, শরীরকে বিশ্রাম দিলে আমি ভোরে ফজর নামাজে মনোযোগ দিতে পারব এবং সারাদিন হালাল উপার্জনের শক্তি পাব, তবে আপনার ওই ঘুমের পুরো সময়টাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
সংসার ও কর্মক্ষেত্র: পরিবারের জন্য খাবার কেনা বা রান্নাবান্না করাকে যদি আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন মনে করেন, তবে প্রতি পদক্ষেপে সওয়াব মিলবে। এমনকি স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়াকেও রাসুল (সা.) সদকা হিসেবে অভিহিত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬)

এহসান: এক অনন্য অনুশীলন
ইবাদতের মানকে ‘লেভেল ১০০’-এ নিয়ে যেতে হলে আমাদের মধ্যে ‘এহসান’ বা অভিনিবেশ তৈরি করতে হবে।

আজ থেকেই একটি ছোট অনুশীলন শুরু করা যেতে পারে। আপনি যখন নামাজ পড়ছেন কিংবা কোনো কাজ করছেন, তখন কল্পনা করুন যে আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।

হাদিসে জিবরাইলে এহসানের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি তাঁকে দেখছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তবে মনে করো তিনি তোমাকে দেখছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)

এই সচেতনতা যখন আমাদের মধ্যে কাজ করবে, তখন কাজের মান এবং একনিষ্ঠতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

‘কেবল তোমারই সাহায্য চাই’—এর প্রকৃত অর্থ
সুরার এই অংশে আমরা বলি, ‘ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়িন’ (শুধু তোমারই সাহায্য চাই)। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমরা তো বন্ধুদের সাহায্য চাই, ভারী আসবাবপত্র সরাতে প্রতিবেশীকে ডাকি। এটা কি শিরক বা এই আয়াতের পরিপন্থী?

একেবারেই নয়। হ্যাঁ, প্রকৃত সাহায্যকারী একমাত্র আল্লাহ।

কিন্তু আমরা যখন মানুষের সাহায্য নিই, তখন তাদের কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে গ্রহণ করি। অন্তরে এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ না চাইলে কোনো মানুষই আমার উপকার করতে পারবে না—এটাই হলো প্রকৃত তাওহিদ।

আমরা মানুষের কাছে সাহায্য চাই জাগতিক উপায় হিসেবে, কিন্তু সাহায্য কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর ওপরই ভরসা করি।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে তোমরা একে অপরের সাহায্য করো।” (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

সুতরাং মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরের বিশ্বাস আল্লাহর ওপর অটল থাকে।

সুরা ফাতিহা কেবল নামাজের অংশ নয়, এটি জীবন পরিচালনার এক পূর্ণাঙ্গ গাইড। আমরা যখন ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়িন’ বলি, তখন আমরা আল্লাহর কাছে নিজেদের সমর্পণ করি।

এই একটি আয়াত যদি আমরা আত্মস্থ করতে পারি, তবে আমাদের দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টাই ইবাদতে পূর্ণ হয়ে উঠবে। আপনার ঘুম, আপনার আহার, আপনার পরিশ্রম—সবই হবে পরকালের পুঁজি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *