চোরাই পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ইসলামের বিধান

বর্তমান সময়ে বাজারে, বিশেষ করে অটোমোবাইল বা গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানে অনেক সময় অত্যন্ত সুলভ মূল্যে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়, যেগুলোর উৎস নিয়ে জনমনে সংশয় থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে এগুলো চুরি বা অবৈধভাবে সংগৃহীত হয়ে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে চোরাই মালামাল কেনা বা এর ব্যবসা করা কেবল অনৈতিকই নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের গুনাহ এবং আইনি অপরাধ।

মালিকানা: বিক্রয় চুক্তির প্রধান শর্ত
ইসলামি আইনে একটি বিক্রয় চুক্তি বা বেচাকেনা বৈধ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, বিক্রেতাকে অবশ্যই বিক্রয়কৃত পণ্যের মালিক হতে হবে অথবা মালিকের পক্ষ থেকে বিক্রয় করার বৈধ অনুমতি থাকতে হবে।

আল–আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আহমদ আল-মুসাইয়ার বলেন, “যেহেতু চুরিকৃত মাল অন্যের হক বা অধিকার, তাই চোর কখনোই এর মালিক হতে পারে না। ফলে তার সঙ্গে করা বিক্রয় চুক্তিটি গোড়াতেই বাতিল বা বাতেল বলে গণ্য হবে।” (মুহাম্মদ আহমদ আল-মুসাইয়ার, আল-ফিকহুল মুয়াসসার, ২/৮৮, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

এই বিধানের মূলে রয়েছে নবীজির নির্দেশনা, “তোমার নিকট যা নেই (অর্থাৎ যার মালিকানা তোমার নেই), তা তুমি বিক্রয় করো না।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫০৩)

যেহেতু চোরের কাছে পণ্যটির দখল থাকলেও তার শরিয়তসম্মত মালিকানা নেই, তাই তার কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করা মূলত একটি অবৈধ লেনদেনে সহযোগিতা করার শামিল।

চোরাই পণ্য ক্রয়ের বিধান ও পর্যায়সমূহ
চুরি করা মালামাল বা যন্ত্রাংশ কেনার বিষয়টি কয়েকটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফকিহগণ একে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন:

১. নিশ্চিত জ্ঞান: যদি কোনো ক্রেতা বা ব্যবসায়ী নিশ্চিতভাবে জানেন যে, তার সামনে উপস্থাপিত পণ্যটি চুরি করা, তবে সেই পণ্য কেনা তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম। এমতাবস্থায় পণ্যটি কিনলে তিনি নিজেও পাপী হবেন এবং চুরির অপরাধে পরোক্ষভাবে শরিক বলে গণ্য হবেন।

২. প্রবল ধারণা: যদি নিশ্চিতভাবে জানা না যায়, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে প্রবল ধারণা হয় যে এটি অবৈধ বা চোরাই পণ্য। যেমন, বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দাম হওয়া বা বিক্রেতার পরিচয় সন্দেহজনক হওয়া। তবে এমন পণ্য কেনাও নিষিদ্ধ।

শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো, ‘প্রবল ধারণা নিশ্চিত জ্ঞানের স্থলাভিষিক্ত হয়।’ আল-ফিকহুল মুয়াসসার, ২/৯০, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

৩. অজ্ঞতা বা সন্দেহজন অবস্থা: যদি পণ্যটি চুরিকৃত হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকে এবং ক্রেতা সরল বিশ্বাসে সাধারণ বাজার থেকে পণ্যটি কেনেন, তবে তার পার হবে না। তবে যদি পরে জানা যায় যে পণ্যটি চুরি করে আনা, তবে প্রকৃত মালিকের হক ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্রেতা কি চোরের সহযোগী
চোরাই পণ্য কেনা মানে হলো চোরকে তার অপরাধ অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করা। যদি কেউ চুরির সামগ্রী না কিনত, তবে চোর চুরি করার কোনো উৎসাহ পেত না। তাই জেনেশুনে চোরাই পণ্য কেনা ব্যক্তিকে হাদিসের আলোকে চোরের সহযোগী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

চোরাই পণ্য ক্রয় করা মূলত এই আয়াতে বর্ণিত ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা’ করারই একটি নামান্তর।

চোর যে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, ক্রেতা সেই অবৈধ সম্পদ ভোগ করার সুযোগ করে দিয়ে সেই পাপে নিজের অংশ নিশ্চিত করছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা তাকওয়ার দাবি
অনেক সময় খুচরা যন্ত্রাংশের বাজারে কোনো পণ্যটি চোরই আর কোনটি হালাল উপায়ে আসা, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ‘ধূসর এলাকা’ বা সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকেও বেঁচে থাকতে উৎসাহিত করেছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, যা অধিকাংশ মানুষ জানে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এই সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার ধর্ম ও সম্মানকে পবিত্র রাখল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৯)।

একজন মুমিন ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি কেবল হারাম থেকেই বেঁচে থাকেন না, বরং যে ব্যবসায় হারাম হওয়ার সামান্যতম সন্দেহ থাকে, তা থেকেও নিজেকে দূরে রাখেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *