দারিদ্র্য থেকে উন্নত জীবনে ইসলামের ৮টি কার্যকর নির্দেশনা
ইসলামি ফিকহে দারিদ্র্যের ধারণা, এর ধরন ও সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। এখানে ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
দারিদ্র্য কী
দারিদ্র্যের সংজ্ঞা দেশ ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। এর সবচেয়ে কঠিন রূপ হলো চরম দারিদ্র্য, যখন মানুষ ন্যূনতম খাবারও পায় না। এ অবস্থায় নবীজি (সা.) ভিক্ষা করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেন,
‘ভিক্ষা জায়েজ তিন ধরনের মানুষের জন্য—চরম দরিদ্র, প্রচণ্ড ঋণগ্রস্ত ও গুরুতর রক্তপণে আক্রান্ত ব্যক্তি।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৪০)
মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি ফকিহদের মতে, দারিদ্র্য মানে মৌলিক চাহিদা—খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয়ের অভাব।
কোরআনে দারিদ্র্যের দুটি দিক উল্লেখ আছে—
১. বর্তমান দারিদ্র্য: ‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমরা তোমাদের ও তাদের জন্য রিজিক দেব।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১৫১)
২. ভবিষ্যতের দারিদ্র্যের আশঙ্কা: ‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমরা তাদের ও তোমাদের জন্য রিজিক দেব।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩১)
দারিদ্র্যের একটি আধ্যাত্মিক কারণ হলো হালাল উপার্জন থেকে দূরে থাকা। কোরআনে বলা হয়েছে,
‘যদি জনপদের লোকেরা ইমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমরা তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবী থেকে বরকতের দ্বার খুলে দিতাম…।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬)
এছাড়া দারিদ্র্য এক ধরনের পরীক্ষাও।
‘আমরা অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, জীবন ও ফসলের ক্ষতি দিয়ে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
জীবনযাত্রার মান হ্রাসের কারণ
জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার দুটি বড় কারণ হলো বেকারত্ব ও দারিদ্র্য।
বেকারত্বের ধরন:
বাধ্যতামূলক বেকারত্ব: কাজের ইচ্ছা থাকলেও কাজ না পাওয়া, যেমন দক্ষতার অভাব বা পেশার অচলাবস্থা।
স্বেচ্ছা বেকারত্ব: কাজ করতে পারলেও ইচ্ছাকৃতভাবে না করা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণত জীবনযাত্রা উন্নত করে, তবে প্রবৃদ্ধি যদি ন্যায্য বণ্টন না আনে, তাহলে প্রকৃত উন্নতি ঘটে না। তাই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্রদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব
দারিদ্র্য ও দারিদ্র্যের অনুভূতি এক নয়। মূল্যস্ফীতিতে অর্থের মান কমে গেলে পণ্যের দাম বাড়ে, আয় কমে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এই চক্র মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের চাপ বাড়ায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দারিদ্র্য সমাজে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে, ধনী-দরিদ্রের ফারাক বাড়ায়। তাই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ন্যায্য বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
ইসলামে দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকনির্দেশ
ইসলাম দারিদ্র্য মোকাবিলায় দুইটি দিক নির্দেশ করে—
১. আকিদা (বিশ্বাস)
২. কারণ গ্রহণ (ব্যবহারিক পদক্ষেপ)
১. আকিদার দিক
ইসলাম আধ্যাত্মিকভাবে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে শক্তি দেয়। এর মূল চারটি দিক—
পুঁজিবাদী চিন্তা প্রত্যাখ্যান: সম্পদ আল্লাহর, মানুষ কেবল তত্ত্বাবধায়ক।
‘তোমরা তা থেকে ব্যয় করো, যাতে তিনি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক করেছেন।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৭)
রিজিকের উৎসে বিশ্বাস:
‘আকাশে তোমাদের রিজিক ও যা প্রতিশ্রুত আছে…।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ২২-২৩)
আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান, রিজিকের সংকীর্ণতার ভয় করো না, আমার ভান্ডার পূর্ণ।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২৪৬৫)
দোয়া ও ইস্তিগফার: ক্ষমা প্রার্থনা রিজিক বাড়ায়।
‘তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো… তিনি তোমাদের প্রচুর বৃষ্টি পাঠাবেন..।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
ইমান ও তাকওয়া:
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমি কুফর ও দারিদ্র্য থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৪৪)
২. ব্যবহারিক উপায়
ইসলাম দারিদ্র্য দূরীকরণে ৮টি বাস্তব পদক্ষেপ নির্দেশ করে—
১. কঠোর পরিশ্রম: ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সহজ করেছেন… তাই এর পথে চলো।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫)
২. হিজরত: ভালো জীবিকার জন্য স্থান পরিবর্তন।
৩. প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার: ‘তিনি পৃথিবীতে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯)
৪. সাশ্রয়ী ব্যয়: ‘খাও, পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
৫. সঞ্চয় ও বিনিয়োগ।
৬. হালাল উপার্জন: ‘তোমাদের জন্য হালাল ও পবিত্র জিনিস খাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭২)
৭. জাকাত ও সাদকা: ‘ধনীদের কাছ থেকে জাকাত নাও এবং তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৭২)
৮. আত্মীয়দের সহায়তা: ‘তোমরা নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও…।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৬)
সমাজে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামের অর্থনীতি পুঁজিবাদের চেয়ে মানবিক। এখানে সম্পদ কেবল পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হলে বৈধ। জাকাত ও ওয়াক্ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হয়। ইতিহাসে ওয়াক্ফ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দরিদ্রসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রাষ্ট্রও প্রয়োজনে জনগণের কল্যাণে সম্পদ জাতীয়করণ বা কর আরোপ করতে পারে—বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে।
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পরস্পর সম্পর্কিত। ইসলাম কাজের প্রতি উৎসাহ দেয়, দক্ষতা বাড়ায় এবং বৈষম্য কমায়। কারণ দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি অজ্ঞতা, রোগ ও সামাজিক অবিচারের সঙ্গে যুক্ত।
উপসংহার
ইসলাম দারিদ্র্য মোকাবিলায় আধ্যাত্মিক ও বাস্তব উভয় পথ দেখায়। বিশ্বাস মানুষকে আশা দেয়, আর পরিশ্রম তাকে এগিয়ে নেয়। জাকাত, সাদকা ও ওয়াক্ফের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলাম শুধু দারিদ্র্য দূর করে না—প্রত্যেক মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দেয়।

Leave a Reply