জীবনে বরকত লাভের ৮ উপায়

https://www.kitabghor.com/products/details/ffaa4ba2ec9a11ecb17e2a6c60b8696b/je-jibon-borkotmoy.htmlবরকত শব্দের আরবি হলো ‘বারাকাহ’, যার অর্থ ‘আশীর্বাদ’, ‘প্রাচুর্য’ বা ‘কল্যাণ বৃদ্ধি’। অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো জিনিসে এমন কল্যাণ দান করা যা অল্প সময়েও বেশি ফল দেয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি, যা জীবন, সম্পদ, স্বাস্থ্য বা সময়—সব ক্ষেত্রেই দেখা যেতে পারে।

অল্প চেষ্টায় কিছু পাওয়া, বা দীর্ঘ সময় কোনো কিছু টিকে থাকা—এটাকেও বরকত বলা হয়।

অনেকে জীবনে উন্নতি ও শান্তির জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন, নানা চেষ্টা করেন। তবুও মনে হয়, ঘরে বরকত নেই—আয় বাড়ে না, কাজের ফল মেলে না, শান্তিও আসে না। তখন তারা হতাশ হয়ে পড়েন।

আসলে বরকত মানে শুধু বেশি অর্জন নয়; বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির ফলে সেই অর্জনে কল্যাণ আসা এবং তা টিকে থাকা।

আল্লাহ যেসব কাজ পছন্দ করেন, সেগুলোর মাধ্যমেই বরকত আসে। অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে বরকত লাভের চেষ্টাই শরিয়াহসম্মত বরকত। নিচে এমন কিছু উপায় তুলে ধরা হলো—


১. কথার মাধ্যমে বরকত

কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে বরকত পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,

“তোমরা কোরআন পাঠ করো, কেননা কিয়ামতের দিন কোরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১০)

আরও বলেছেন,

“যে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, সেখানে প্রশান্তি ও বরকত নাজিল হয়।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৯৬)


২. কাজের মাধ্যমে বরকত

ইলম অর্জন ও তার ওপর আমল করার মাধ্যমে বরকত পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)


৩. অবস্থার মাধ্যমে বরকত

একসঙ্গে বসে খাওয়া ও ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাওয়া শুরু করলে বরকত আসে।
ওহশি ইবনে হারব (রা.) বলেন, সাহাবারা বললেন,

“হে আল্লাহর রাসুল, আমরা খাই, কিন্তু পেট ভরে না।”
তিনি বললেন,
“তোমরা একত্রে বসে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আহার করো, তাহলে তাতে তোমাদের জন্য বরকত দান করা হবে।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৭৬৪)


৪. স্থানে বরকত

মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি, মসজিদুল আকসা, মক্কা ও মদিনা—এসব স্থানে ইবাদতের মাধ্যমে বরকত লাভ হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,

“আমার মসজিদে এক নামাজ মসজিদে হারাম ছাড়া অন্য সব মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম। আর মসজিদে হারামে এক নামাজ অন্য মসজিদে এক লাখ নামাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪০৬)


৫. সময়ে বরকত

বিশেষ সময়গুলোতেও বরকত থাকে, যেমন—লায়লাতুল কদর, রমাদানের শেষ দশক, জিলহজের প্রথম দশক, জুমার দিন, ফজরের পর, কিংবা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে ইবাদত করা।

আল্লাহ বলেন,

“নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি বরকতময় রাতে…”
(সুরা দুখান, আয়াত: ৩)

রাসুল (সা.) সকালবেলার জন্য দোয়া করতেন—

“হে আল্লাহ, তুমি আমার উম্মতের জন্য সকালকে বরকতময় করো।”
(আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৮; তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)

তাই ভোরে উঠে কাজ শুরু করলে তাতে বরকত আসে।


৬. খাদ্যে বরকত

জয়তুন তেল, মধু, দুধ, কালিজিরা ও জমজমের পানি বরকতময় খাদ্য।
রাসুল (সা.) বলেছেন,

“জমজমের পানি বরকতময়।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭৩)

আরও বলেন,

“তোমরা কালিজিরা ব্যবহার করো, কেননা মৃত্যু ছাড়া সব রোগের নিরাময় এতে রয়েছে।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৪৪৭)


৭. পশুর মাধ্যমে বরকত

রাসুল (সা.) বলেছেন,

“ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ রয়েছে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫২)

যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে ব্যবহারের জন্য ঘোড়া পালন করে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য সওয়াব লেখা হয়।


৮. বৃক্ষের মাধ্যমে বরকত

গাছ লাগানোও বরকতময় কাজ।
রাসুল (সা.) বলেন,

“যখন কোনো মুসলিম গাছ লাগায় বা ফসল বোনে এবং মানুষ, পশু বা পাখি তা খায়, এটা তার জন্য সাদকা হিসেবে গণ্য হয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৫৩)

কোরআনেও খেজুর, আঙুর, ডালিম, জলপাই ইত্যাদি ফলের প্রশংসা এসেছে। খেজুর ইফতারে রাখা সুন্নাহ, সাহরিতেও তা শ্রেষ্ঠ খাদ্য হিসেবে বলা হয়েছে।


সবশেষে বলা যায়—
বরকত আসে উত্তম নিয়ত ও শরিয়াহসম্মত পথে চলার মাধ্যমে।
যদি সব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে করা হয়, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা, শান্তি এবং জীবনে সত্যিকারের বরকত নেমে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *