দারিদ্র্য: মানবজীবনের বোঝা নয়, পরিবর্তনের আহ্বান

দারিদ্র্য সাধারণত পকেট শূন্য থাকার অর্থে বোঝানো হলেও, এর প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানসিক শান্তিতেও গভীরভাবে আঘাত করে।
ইসলামি দৃষ্টিতে দারিদ্র্য মানে এমন অবস্থা, যখন কেউ নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণের মতো সম্পদ বা উপার্জন রাখে না।

দারিদ্র্য: স্থায়ী নয়, পরিবর্তনশীল অবস্থা
দারিদ্র্য কোনো স্থায়ী গুণ নয়; এটি একটি অস্থায়ী অবস্থা, যা সমাজ ও অর্থনীতির মানদণ্ডে পরিবর্তিত হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, যখন খাদ্য, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে, তখনই দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে দিনে এক ডলারের কম আয়ে জীবনযাপনকে “চরম দারিদ্র্য” বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, বছরে ব্যক্তিপ্রতি আয় যদি ৬০০ ডলারের কম হয়, তাকে দরিদ্র ধরা হয়। এমন ৪৫টি দেশ আছে—মূলত আফ্রিকায়—যেখানে ১৫টি দেশে ব্যক্তিপ্রতি আয় ৩০০ ডলারেরও নিচে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমনকি ধনী দেশেও দারিদ্র্য আছে—আমেরিকায় প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যা তাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ।

দারিদ্র্যের প্রভাব
দারিদ্র্যের প্রভাব গভীর ও বহুস্তরীয়। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা জন্মের সময়ই নানা স্বাস্থ্যসমস্যায় ভোগে—কম ওজন, অপুষ্টি, দৃষ্টি ও শ্রবণ সমস্যা, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি। এসব কারণে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, স্কুলে অনুপস্থিতি বাড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেশি থাকে।

জাতিসংঘের তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে; এর মধ্যে ৬৩০ মিলিয়ন চরম দারিদ্র্যে। ১.৫ বিলিয়ন মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে, আর প্রতি তিন শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে। প্রতি বছর প্রায় ১৩ মিলিয়ন শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ করার আগেই অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার কারণে মারা যায়।

দারিদ্র্য ও মস্তিষ্কের প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবের দারিদ্র্য মস্তিষ্কের বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। গুয়াতেমালায় ১৯৬০–এর দশকে এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা জন্মের প্রথম তিন বছরে পুষ্টিকর খাবার পেয়েছিল, তারা শারীরিকভাবে বেশি বেড়েছে এবং পড়াশোনায় ভালো ফল করেছে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, সেই শিশুরা বড় হয়ে বেশি শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়েছে।

অন্যদিকে, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য শিশুদের বুদ্ধিবিকাশে বাধা দেয়। তাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অঞ্চলে অতিরিক্ত কার্যকলাপ দেখা যায়—যা ভয় ও নেতিবাচক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে ফ্রন্টাল লোবের কার্যকলাপ কমে, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়ায় হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।

ইসলামে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই
ইসলাম দারিদ্র্যকে সমাজের জন্য বিপদ মনে করে। নবীজি (সা.) দোয়া করেছেন,

“হে আল্লাহ, আমি কুফর, দারিদ্র্য ও কবরের আজাব থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।”
(আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৪৪)
তিনি আরও বলেছেন,

“যে ঋণগ্রস্ত হয়, সে কথায় মিথ্যা বলে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০০)
হজরত উমর (রা.) বলেছিলেন, “যদি দারিদ্র্য কোনো মানুষ হতো, আমি তাকে হত্যা করতাম।”
একটি প্রবাদও আছে, “দারিদ্র্য যখন কোনো দেশে প্রবেশ করে, কুফর বলে—আমাকেও সঙ্গে নাও।”

কোরআনে বলা হয়েছে,

“তোমরা দারিদ্র্যের ভয় থেকে সন্তান হত্যা করো না, আমরা তোমাদের ও তাদের রিজিক দেব।”
(সুরা আনআম, আয়াত: ১৫১)
দারিদ্র্য মানুষকে অন্যায়ের পথে ঠেলে দিতে পারে, তাই ইসলাম এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে।

ইসলামি দারিদ্র্য দূরীকরণ ব্যবস্থা
জাকাত: ইসলামে ধনীদের সম্পদের ২.৫% থেকে ৫% দরিদ্রদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত।

“জাকাত কেবল ফকির, মিসকিন, এর কর্মকর্তা, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য।”
(সুরা তাওবা, আয়াত: ৬০)
সদকা ও অনাথদের যত্ন: ইসলাম স্বেচ্ছাদান ও এতিম-বিধবাদের সহযোগিতা উৎসাহিত করে।

“তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং ব্যয় করো, এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যারা নিজেদের কৃপণতা থেকে মুক্ত থাকে, তারাই সফল।”
(সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬)
রাষ্ট্রের দায়িত্ব: ইসলামি রাষ্ট্র দরিদ্রদের চাহিদা পূরণ ও ঋণ পরিশোধে সাহায্য করে, যাতে সমাজে কেউ বিলাসিতায় আর কেউ অভাবে না থাকে।

ইসলাম সম্পদকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করে। কোরআনে বলা হয়েছে,

“তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি, তারপর আশ্রয় দিয়েছেন? তোমাকে পথভ্রষ্ট পাননি, তারপর পথ দেখিয়েছেন? তোমাকে দরিদ্র পাননি, তারপর সমৃদ্ধ করেছেন?”
(সুরা দুহা, আয়াত: ৬–৮)
উপসংহার
দারিদ্র্য শুধু শরীর নয়, মন ও মস্তিষ্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি শিশুদের বিকাশে বাধা দেয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
ইসলাম দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে জাকাত, সদকা ও সামাজিক দায়িত্বের মাধ্যমে এক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলেছে, যাতে প্রত্যেক মানুষ ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পেতে পারে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *