তওবা শুধু মুখের নয়, হৃদয়েরও
অনেকে সহজেই বলে ফেলেন—আল্লাহ তো অনেক দয়ালু, নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবেন। তাই তারা গুনাহ করেও চিন্তামুক্ত থাকে। কেউ ভাবে, “আমার এসব তো ছোটখাটো গুনাহ, পরে ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ বললেই মাফ হয়ে যাবে।” আবার কেউ ভাবে, সওয়াবের কাজ করব, গুনাহও করব—একটা আরেকটা কেটে যাবে।
অনেকে উদাহরণ দেন—একজন পতিতা পানি পান করানোর কারণে জান্নাতে গেছে, বা কেউ একশোটা খুন করেও ক্ষমা পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবার ভাগ্যে কি এমনটা হবে? কার প্রতি আল্লাহ ক্ষমাশীল হবেন, তা কেউ জানে না। যাদের আল্লাহ ক্ষমা করেছেন, হতে পারে তারা না জেনেই গুনাহ করেছিলেন, পরে অনুতপ্ত হয়ে এমনভাবে তওবা করেছেন যে আর কখনো সেই গুনাহে ফেরেননি।
জেনেশুনে গুনাহ করা আর ভুল করে করা এক নয়। তওবা কবুল হওয়ার শর্তগুলোর একটি হলো—অন্তর থেকে এমন অনুশোচনা করা যেন আর কখনো সেই ভুলে না ফেরে। আল্লাহ বান্দার প্রকাশ্য-গোপন সবই জানেন। কে ইচ্ছে করে গুনাহ করছে, কে অজান্তে—তাঁর অজানা কিছু নেই। তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই; তিনি “লাতিফুল খবির”—অতি সূক্ষ্মদর্শী।
আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) নিজে জান্নাতপ্রাপ্ত হয়েও প্রতিদিন সত্তরবারের বেশি ইস্তিগফার করতেন, অথচ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ গুনাহমুক্ত। তাহলে তাঁর উম্মত হয়ে আমরা কীভাবে নিশ্চিন্তে গুনাহ করি? কীভাবে ভাবি, “ক্ষমা তো মিলবেই”?
হ্যাঁ, আল্লাহ অতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল, কিন্তু অবাধ্যদের প্রতি তিনি কঠোরও। বান্দার গুনাহ আকাশ পরিমাণ হলেও যদি সে সত্যিকারে তওবা করে, আল্লাহ ক্ষমা করেন। তবে তার জন্য হৃদয়ে অপরাধবোধ জাগতে হবে, গুনাহের জন্য লজ্জিত হতে হবে এবং আর না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সুরা ত্বহায় আল্লাহ বলেন—
“আর যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল।” (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৮২)
তবে তওবা মুখে বললেই হয় না; কবুল হওয়ার কিছু শর্ত আছে—
গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া,
পুনরায় সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া,
আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধচিত্তে ক্ষমা চাওয়া,
কারো প্রতি অন্যায় করলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
গুনাহ করতে করতে অনেকের এমন অবস্থা হয় যে গুনাহকে আর খারাপ মনে হয় না। তখন সে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর ছোট গুনাহকেও তুচ্ছ মনে করে। অথচ ছোট একটি ছিদ্র যেমন বড় জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি ক্ষুদ্র গুনাহও ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন—
“মুমিন নিজ গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে—ভয় করে যে সেটি তার ওপর পড়বে; আর পাপী তার গুনাহকে মাছির মতো মনে করে, যা নাকের ওপর বসে একটু পর উড়ে যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৪৯)
তবুও আল্লাহর দয়া সীমাহীন। তিনি চান, মানুষ গুনাহের পরও গুনাহমুক্ত অবস্থায় বিচারদিবসে আসুক। রাসুল (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি পাপ থেকে তওবা করে, সে এমন হয় যেন সে কখনো পাপই করেনি।”
আরো বলেছেন—
“আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী। তাদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তওবাকারী।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)
কিন্তু যারা গুনাহ করতে করতে ভাবে, “পরে তওবা করে নেব”, তারা কি নিশ্চিত যে সেই সুযোগ পাবে? মৃত্যু কাউকে সময় দেয় না—কেউ কথা বলতে বলতে, কেউ হাসতে হাসতে, কেউ ঘুমের মধ্যেই চলে যায়। তারা কি জানত, এটাই তাদের শেষ নিঃশ্বাস?
তবু আল্লাহর দয়ার দরজা খোলা থাকে যতক্ষণ প্রাণ গলায় পৌঁছায়নি। তাই দেরি না করে বলা উচিত—
“হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা গ্রহণকারী ও পরম দয়ালু।”
(সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৮১৪)

Leave a Reply